যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা ইমরানের পক্ষে সহজ হবে না

আন্তর্জাতিক

পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা খুব মজার অভিজ্ঞতা হবে না। তিনি যত শিগগির স্বাভাবিকীকরণের দিকে নজর দেবেন, ততই মঙ্গল।

পাকিস্তানের প্রভাবশালী ডন পত্রিকার মতে, এমনিতেই সুসময়েও পাকিস্তান শাসন করা দুরূহ কাজ। তার ওপর দেশটি যখন অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আর কূটনৈতিক চাপের মধ্যে থাকে, তখন কী হতে পারে বুঝতে কল্পনাশক্তির অধিকারী হতে হয় না। এ দুয়ের সমাধান পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। ব্যথা উপশমের একটা চাবি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। তবে ভাবী প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের জন্য খুব সহজ হবে না এই সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান।

বিজয়ীর ভাষণে ইমরান বেশ প্রাজ্ঞ, মৈত্রীসূচক ও উদ্দীপনামূলক কথা বলেছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে তাঁর কথা অস্বস্তিকর। এ ক্ষেত্রে তিনি একজন গতানুগতিক পাকিস্তানির ভাষায় কথা বলেছেন। যার মূল সুর, পাকিস্তানের সঙ্গে অসদাচরণ করা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কটি ‘পারস্পরিক লাভজনক’ ও ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ হতে হবে। একজন ঝানু রাষ্ট্রনায়ক হয়তো এখানে কৌশলী হতে চেষ্টা করবেন। কিন্তু ইমরান বোধ হয় বিষয়টা নিয়ে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চান। তা করতে গেলে তিনি নিজেকে কঠিন পরিস্থিতিতে আবিষ্কার করতে পারেন।

ইমরানের জয় ওয়াশিংটনের পছন্দের বিকল্প ছিল না। তাঁর সম্পর্কে যা কিছু বলা বা ভাবা হয়েছে, এর সবই তালেবানদের প্রতি তাঁর সহানুভূতিশীল মনোভাবের প্রেক্ষাপটে।

/////////

ইমরানের ঘনিষ্ঠজনেরা বলে থাকেন, তাঁকে ভুল বোঝা হচ্ছে। হয়তো তা-ই। কিন্তু অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ও তালিবানদের পক্ষে তিনি অনেক কড়া কথা বলেছেন এবং সেগুলো কখনোই শুধরানোর চেষ্টা করেননি। যেমন সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনেকেই তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্বাভাবিক করা উচিত। কিন্তু ইমরান সেসব কানে তোলেননি।

পাকিস্তানের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে—বিরোধী দলের সবাই এমন অভিযোগ করছেন। এ ব্যাপারে নীরব কেবল ইমরানের পিটিআই। যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টা ভালো নজরে নেয়নি। নির্বাচনের আগের দিন অবধি এদিকে ওয়াশিংটনের দৃষ্টি ছিল না বললেই চলে। ডিসি অন্যান্য আন্তর্জাতিক সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু নির্বাচনের পরপরই এদিকে চোখ পড়েছে তার। ভোটে কারচুপি এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইমরানের মাখামাখির ব্যাপারটা তারা পর্যবেক্ষণ করছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে দেনদরবারে এসব কথা বারবার উঠতে পারে।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইমরানের হাত বাঁধা। যেমন যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক পারস্পরিক লাভজনক ছিল না—এমন ভাবনা থেকে তাঁকে সরে আসতে হবে। কার্যত, উভয় দেশই এই সম্পর্ক থেকে প্রভূত লাভবান হয়েছে। একজনকে ছাড়া অপরজন সমস্যায় থাকত। কিন্তু ‘ভারসাম্য’ সম্ভব নয়। বস্তুত, স্বল্প মেয়াদে, সরকারের ভারসাম্যের ইচ্ছা তাঁর অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টার বিরুদ্ধে কাজ করবে। আইএমএফকে পাশে পাওয়া পাকিস্তানের প্রয়োজন হবে। যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে অনেকটা খোলাখুলিই বলেছে, দাতা সংস্থা কোন দিক ঝুঁকবে, তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের ওপর।

এটা আমাদের মূল প্রশ্নে নিয়ে আসে। ইমরান কি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে আমেরিকার একমাত্র এজেন্ডা, আফগানিস্তানের ব্যাপারে নতুন কিছু করবেন, যা আমেরিকার মনোভাব পরিবর্তন করতে পারে?

সেটা জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র বরাবর বলে আসছে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে পাকিস্তানকে সব জায়গায় বেশি করে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। ইমরান এই ‘বেশি করে’ অগ্রণী ভূমিকা পালনের ব্যাপারটা পছন্দ করছেন না। এই মনোভাব তাঁর সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমীকরণ আরও জটিল করে তুলতে পারে। শাসকচক্র যদি তাঁকে যদি অন্যভাবে ভাবতে বাধ্য করে, তিনি হয়তো তাঁর প্রথম পরীক্ষা অভিজ্ঞতা করবেন। এটা মোটামুটি নিশ্চিত, কড়া মনোভাব আখেরে পাকিস্তানের ক্ষতি করবে। তালেবানদের বোঝাতে হবে, আফগানিস্তানে শান্তি স্থাপনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় অংশ নেওয়া সবার জন্যই মঙ্গলজনক। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের কাছে এই সমর্থন চায়, কিন্তু পাশাপাশি এও আশা করে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে তারা আরও বেশি করে সক্রিয় হবে।

ইমরান খানের বিদেশনীতি কেমন হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তিনি কী ধরনের সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী, তার ইঙ্গিত মিলবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেছে নেওয়ায়। সেনাবাহিনীর পছন্দের কাউকে যদি এ পদে বসানো হয়, অচলাবস্থা বজায় থাকবে বলেই মনে হয়।

মোটের ওপর, ভাবী প্রধানমন্ত্রীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা খুব মজার অভিজ্ঞতা হবে না। তিনি যত তাড়াতাড়ি এদিকটায় নজর দেবেন, ততই মঙ্গল হবে।
…………………….
সূত্র: প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *